Showing posts with label অ-ও. Show all posts
Showing posts with label অ-ও. Show all posts

Thursday, July 17, 2014

আজি এ বসন্তে-ইমরান কামাল

শীতেরা গর্তে ফিরে যাচ্ছে
বসন্ত এসেছে… অবশেষে…
কে-জানি হঠাৎ আজ ভোরে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে গেলো
এবার বসন্তের রঙ হবে শুধুই সবুজ আর লাল
এ কেমন বসন্ত?
আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, দুই রঙের বসন্ত কেমন হবে
আর আকাশে আগুন লাগতেই
আগুন যেমন পোড়ায়, আমি রঙের দহে পুড়তে শুরু করলাম
দেখলাম শহরের মাটিয়াল দেহে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে অগুণতি ঘাস
বসন্তের প্রথম দিনেই ওরা অদ্ভূত গাঢ় সবুজ…
যেন মাটির তলা থেকেই সবুজে পেকে উঠেছে
আমি দেখলাম শহরের প্রতিটি গাছে লাললাল ছোপ
ওরা ফুল, এ বসন্তের শহরে আজ প্রতিটি ফুলের রঙ লাল
ওরা যেন রক্তের তীব্র দহন নিয়ে ফুটেছে
কে-জানি হঠাৎ কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে গেলো
এ বসন্তে কোকিল কুহু রবে ডাকবে না
পাপিয়ারা থাকবে নিশ্চুপ
আর সাদা বক তার ডানা লুকিয়ে ফেলবে কচুরীপানার আড়ালে
সুদর্শন উড়বে না
গাঁদা ফুল ফুটবে না
ফুল খুঁজবে না মধুকীট
মৌচাক খুঁজবে না মৌয়াল
এ বসন্তে ধনুর্ভঙ্গ-পণে বসবে পেঁয়াজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা
সদ্যজাত লাল-সবুজ প্রজাপতির দল,
চলবে খোলস-ভাঙার মেলা
আর এক সলাজ দেহের মৌনতা-ভাঙা তরুণীর চিৎকারে চিরে যাবে আকাশ
আমি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি…!
একটি বাক্যই হবে এ বসন্তের শিরোনাম
আমি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি…!
নদীর প্রতিটি জলবিন্দু থেকে
মাটির প্রতিটি কণায় প্রতিধ্বনিত হবে সেই স্বর
আমি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি…!
অনুরিত হবে প্রতিটি গাছের শিকড় থেকে প্রতিটি প্রাণের শিরায়
আমি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি…!
বসন্ত এসেছে…অবশেষে…
শীতেরা গর্তে ফিরে যাচ্ছে।

দোতলার ল্যন্ডিং মুখোমুখি ফ্ল্যাট। একজন সিঁড়িতে, একজন দরোজায়-আহসান হাবীব

: আপনারা যাচ্ছেন বুঝি?
: চলে যাচ্ছি, মালপত্র উঠে গেছে সব।
: বছর দুয়েক হলো, তাই নয়?
: তারো বেশি। আপনার ডাকনাম শানু, ভালো নাম?
: শাহানা, আপনার?
: মাবু।
: জানি।
: মাহবুব হোসেন। আপনি খুব ভালো সেলাই জানেন।
: কে বলেছে। আপনার তো অনার্স ফাইনাল, তাই নয়?
: এবার ফাইনাল
: ফিজিক্স-এ অনার্স।
: কি আশ্বর্য। আপনি কেন ছাড়লেন হঠাৎ?
: মা চান না। মানে ছেলেদের সঙ্গে বসে…
: সে যাক গে, পা সেরেছে?
: কি করে জানলেন?
: এই আর কি। সেরে গেছে?
: ও কিছু না, প্যাসেজটা পিছল ছিলো মানে…
: সত্যি নয়। উঁচু থেকে পড়ে গিয়ে…
: ধ্যাৎ। খাবার টেবিলে রোজ মাকে অতো জ্বালানো কি ভালো?
: মা বলেছে?
: শুনতে পাই? বছর দুয়েক হলো, তাই নয়?
: তারো বেশি। আপনার টবের গাছে ফুল এসেছে?
: নেবেন? না থাক। রিকসা এলো, মা এলেন, যাই।
: যাই। আপনি সন্ধেবেলা ওভাবে পড়বেন না,
  চোখ যাবে, যাই।
: হলুদ শার্টের মাঝখানে বোতাম নেই, লাগিয়ে নেবেন, যাই।
: যান, আপনার মা আসছেন। মা ডাকছেন, যাই।

রিপোর্ট ১৯৭১ – আসাদ চৌধুরী

প্রাচ্যের গানের মতো শোকাহত, কম্পিত, চঞ্চল
বেগবতী তটিনীর মতো স্নিগ্ধ, মনোরম
আমাদের নারীদের কথা বলি, শোনো।
এ-সব রহস্যময়ী রমণীরা পুরুষের কণ্ঠস্বর শুনে
বৃক্ষের আড়ালে স’রে যায়-
বেড়ার ফোঁকড় দিয়ে নিজের রন্ধনে
তৃপ্ত অতিথির প্রসন্ন ভোজন দেখে
শুধু মুখ টিপে হাসে।
প্রথম পোয়াতী লজ্জায় অনন্ত হ’য়ে
কোঁচরে ভরেন অনুজের সংগৃহীত কাঁচা আম, পেয়ারা, চালিতা-
সূর্য্যকেও পর্দা করে এ-সব রমণী।
অথচ যোহরা ছিলো নির্মম শিকার
সকৃতজ্ঞ লম্পটেরা
সঙ্গীনের সুতীব্র চুম্বন গেঁথে গেছে-
আমি তার সুরকার- তার রক্তে স্বরলিপি লিখি।
মরিয়ম, যীশুর জননী নয় অবুঝ কিশোরী
গরীবের চৌমুহনী বেথেলহেম নয়
মগরেবের নামাজের শেষে মায়ে-ঝিয়ে
খোদার কালামে শান্তি খুঁজেছিলো,
অস্ফুট গোলাপ-কলি লহুতে রঞ্জিত হ’লে
কার কী বা আসে যায়।
বিপন্ন বিস্ময়ে কোরানের বাঁকা-বাঁকা পবিত্র হরফ
বোবা হ’য়ে চেয়ে দ্যাখে লম্পটের ক্ষুধা,
মায়ের স্নেহার্ত দেহ ঢেকে রাখে পশুদের পাপ।
পোষা বেড়ালের বাচ্চা চেয়ে-চেয়ে নিবিড় আদর
সারারাত কেঁদেছিলো তাহাদের লাশের ওপর।
এদেশে যে ঈশ্বর আছেন তিনি নাকি
অন্ধ আর বোবা
এই ব’লে তিন কোটি মহিলারা বেচারাকে গালাগালি করে।
জনাব ফ্রয়েড,
এমন কি খোয়াবেও প্রেমিকারা আসে না সহজ পায়ে চপল চরণে।
জনাব ফ্রয়েড, মহিলারা
কামুকের, প্রেমিকের, শৃঙ্গারের সংজ্ঞা ভুলে গ্যাছে।
রকেটের প্রেমে পড়ে ঝ’রে গ্যাছে
ভিক্টোরিয়া পার্কের গীর্জার ঘড়ি,
মুসল্লীর সেজদায় আনত মাথা
নিরপেক্ষ বুলেটের অন্তিম আজানে স্থবির হয়েছে।
বুদ্ধের ক্ষমার মূর্তি ভাঁড়ের মতন
ভ্যাবাচেকা খেয়ে প’ড়ে আছে, তাঁর
মাথার ওপরে
এক ডজন শকুন মৈত্রী মৈত্রী ক’রে
হয়তো বা উঠেছিলো কেঁদে।

শহীদদের প্রতি – আসাদ চৌধুরী

তোমাদের যা বলার ছিল
বলছে কি তা বাংলাদেশ ?
শেষ কথাটি সুখের ছিল ?
ঘৃণার ছিল ?
নাকি ক্রোধের,
প্রতিশোধের,
কোনটা ছিল ?
নাকি কোনো সুখের
নাকি মনে তৃপ্তি ছিল
এই যাওয়াটাই সুখের।
তোমরা গেলে, বাতাস যেমন যায়
গভীর নদী যেমন বাঁকা
স্রোতটিকে লুকায়
যেমন পাখির ডানার ঝলক
গগনে মিলায়।
সাঁঝে যখন কোকিল ডাকে
কারনিসে কি ধুসর শাখে
বারুদেরই গন্ধস্মৃতি
ভুবন ফেলে ছেয়ে
ফুলের গন্ধ পরাজিত
স্লোগান আসে ধেয়ে।
তোমার যা বলার ছিল
বলছে কি তা বাংলাদেশ ?

স্মৃতিস্তম্ভ-আলাউদ্দিন আল আজাদ

স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার ? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো
চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো ! যে-ভিত কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে
হীরের মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার
খুরের ঝটকা ধুলায় চূর্ণ যে পদ-প্রান্তে
যারা বুনি ধান
গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাঁপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য ।
ইটের মিনার
ভেঙেছে ভাঙুক ! ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী
চারকোটি পরিবার ।
এ-কোন মৃত্যু ? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠেনা কান্না, ঝরেনা অশ্রু ?
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং
এ-কোন মৃত্যু ? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার ? কেবল সেতার
হয় প্রপাতের মোহনীয় ধারা, অনেক কথার
পদাতিক ঋতু কলমেরে দেয় কবিতার কাল ?
ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক । একটি মিনার গড়েছি আমরা
চারকোটি কারিগর
বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায় ।
পলাশের আর
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই
শহীদের নাম
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নাম ।
তাই আমাদের
হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক
শপথের ভাস্কর ।

ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায় – আব্দুল লতিফ

ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়
কথা: আব্দুল লতিফ
সুর: আব্দুল লতিফ
ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়
ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে-পায়ে
ওরা কথায় কথায়
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমাদেরই হাতে-পায়ে
ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়
ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়
কইতো যাহা আমার দাদায়, কইছে তাহা আমার বাবায়
কইতো যাহা আমার দাদায়, কইছে তাহা আমার বাবায়
এখন কও দেহি ভাই মোর মুখে কি অন্য কথা শোভা পায়
কও দেহি ভাই
এখন কও দেহি ভাই মোর মুখে কি অন্য কথা শোভা পায়
ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়
ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়
সইমু না আর সইমু না, অন্য কথা কইমু না
যায় যদি ভাই দিমু সাধের জান, আহা যায় যদি ভাই দিমু সাধের জান,
এই জানের বদল রাখুম রে ভাই, বাব-দাদার জবানের মান
ও হো..হো..হো….বাব-দাদার জবানের মান
যে শুইনাছে আমার দেশের গাঁওগেরামের গান
নানান রঙয়ের নানান রসে, ভইরাছে তার প্রাণ
যে শুইনাছে আমার দেশের গাঁওগেরামের গান
নানান রঙয়ের নানান রসে, ভইরাছে তার প্রাণ
যপ-কীর্তন, ভাসান-জারি, গাজীর গীত আর কবি সারি
যপ-কীর্তন, ভাসান-জারি, গাজীর গীত আর কবি সারি
আমার এই বাংলাদেশের বয়াতিরা নাইচা নাইচা কেমন গায়
বাংলাদেশের
আমার এই বাংলাদেশের বয়াতিরা নাইচা নাইচা কেমন গায়
ওরা কাদের মুখের কথা কাইরা নিতে চায়
ওরা কাদের মুখের কথা কাইরা নিতে চায়
তারি তালে তালে হৈ ঢোল করতাল বাজে ঐ
বাশি কাশি খঞ্জনি সানাই, (আহা) বাশি কাশি খঞ্জনি সানাই
এখন কও দেখি ভাই এমন শোভা কোথায় গেলে দেখতে পাই
ও হো..হো..হো….কোথায় গেলে দেখতে পাই
পূবাল বায়ে বাদাম দিয়া লাগলে ভাটির টান
গায়রে আমার দেশের মাঝি
ভাটিয়ালি গান, (ভাইরে) ভাটিয়ালি গান
তার ভাটিয়াল গানের সুরে মনের দুসখু যায়রে দূরে
বাজায় বাশি সেইনা সুরে রাখাল বনের ছায়
রাখাল বনের ছায়
ওরা যদি না দেয় মান আমার দেশের যতই যাক
তার সাথে মোর নাড়ীর যোগাযোগ, আছে তার সাথে মোর নাড়ীর যোগাযোগ
এই আপদ-বিপদ দুঃখে কষ্টে এ গান আমার ভোলায় শোক
ও হো..হো..হো….এ গান আমার ভোলায় শোক
এই ঠুং ঠুংয়া ঠুং দোতারা আর সারিন্দা বাজাইয়া
গায়ের যোগী ভিক্ষা মাগে প্রেমের সারি গাইয়াগো
প্রেমের সারি গাইয়া
এই ঠুং ঠুংয়া ঠুং দোতারা আর সারিন্দা বাজাইয়া
গায়ের যোগী ভিক্ষা মাগে প্রেমের সারি গাইয়াগো
প্রেমের সারি গাইয়া
একতারা বাজাইয়া বাউল ঘুচায় মনের সকল আউল
একতারা বাজাইয়া বাউল ঘুচায় মনের সকল আউল
তারা মার্ফতি মুর্শিদি তত্ত্বে পথের দিশা দিয়া যায়
মার্ফতি মুর্শিদি তত্ত্বে পথের দিশা দিয়া যায়
ওরা তাদের মুখের কথা কাইরা নিতে চায়
ওরা তাদের মুখের কথা কাইরা নিতে চায়
ওরে আমার বাংলারে, ওরে সোনার ভান্ডারে
আরো কত আছে যে রতন আহা আরো কত আছে যে রতন
মূল্য তাহার হয়না দিলেও মনি মুক্তা আর কাঞ্চন
ও হো..হো..হো….মনি মুক্তা আর কাঞ্চন
আরেক কথা মনে হইলে আঁখি ঝইড়া যায়
ঘুমপাড়াইনা গাইত যে গান মোর দুঃখিনী মায়
আরেক কথা মনে হইলে আঁখি ঝইড়া যায়
ঘুমপাড়াইনা গাইত যে গান মোর দুঃখিনী মায়
ওমায় সোনা মানিক যাদু বলে চুমা দিয়া লইত কোলে
সোনা মানিক যাদু বলে চুমা দিয়া লইত কোলে
আরো আদর কইরা কইত মোরে আয় চান আমার বুকে আয়
আদর কইরা
আরো আদর কইরা কইত মোরে আয় চান আমার বুকে আয়
ওরা মায়ের মুখের কথা কাইরা নিতে চায়
ওরা মায়ের মুখের কথা কাইরা নিতে চায়
কও আমার মায়ের মত গান, আমার মায়ের মত প্রাণ
বাংলা বিনে কারো দেশে নাই, বাংলা বিনে কারো দেশে নাই
এই মায়ের মুখের মধুর বুলি কেমন কইরা ভুলুম ভাই
ও হো..হো..হো….কেমন কইরা ভুলুম ভাই
এই ভাষারই লাইগা যারা মায়ের দেয় ভুলান
দেশের মাটি বুকের খুনে কইরা গেছে লাল
এই ভাষারই লাইগা যারা মায়ের দেয় ভুলান
দেশের মাটি বুকের খুনে কইরা গেছে লাল
মনে কইরা তরার কথা কান্দে বনের তরু লতা
মনে কইরা তরার কথা কান্দে বনের তরু লতা
তাইতো ঘরে ঘরে কত মা তায় চোখের জলে বুক ভাসায়
ওরা মায়ের মুখের কথা কাইরা নিতে চায়
ওরা মায়ের মুখের কথা কাইরা নিতে চায়
কইরো না আর দুঃখ শোক শোনরে গাঁও গেরামের লোক
শোন শোন গঞ্জের সোনা ভাই, তোমরা শোন শোন গঞ্জের সোনা ভাই
একবার বুক ফুলাইয়্যা কও দেখি ভাই
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই………
………………………………………………………
শিল্পী আব্দুল লতিফ সাহেব ছিলেন একজন অসাধারণ মানুষ I মাঝে মাঝে উনি উপলব্ধি করতেন যে, কে যেন ওনাকে জোরে চেপে ধরত I তখনই ওনাকে কাগজ কলম নিয়ে বসে যেতে হত এবং যা কিছু মনে আসত তা লিখে ফেলতেন I এর পরে উনি আবার ওনার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতেন i তার মানে এই যে উনি অনুভব করতেন যে, কে যেন তাকে দিয়ে তার গানগুলো লিখতে বাধ্য করতো I ওনার গানের কথাগুলো যেন কোনো অদৃশ্য উত্স থেকে আসত Iওনার বিখ্যাত “সোনা , সোনা , সোনা, লোকে বলে সোনা ” গানটি লেখা , সুর দেওয়া এবং গাওয়া শেষ হয়েছিল একই বসায় ৩০ মিনিটের ভেতর I বড় বড় কবিরা হয়ত তাদের কবিতাগুলো এভাবেই লিখেছেন I
যখন কোনো একটা বড় ঘটনা ঘটত তখনি উনি বসে যেতেন এবং সেই ঘটনার উপর একখানা গান লেখে এবং সুর দিয়ে গেয়ে দিতেন I শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সাহেবের মৃত্যুর কথা শুনেই তিনি বসে গেলেন গান লিখতে I ওই দিনই তিনি তার অনেক লম্বা মর্সিয়া গাইলেন রেডিওতে I সেদিন সমস্ত বাঙালি জাতি কেদেছিল তার সেই মর্সিয়া শুনে I একদিন ওনার এক ছোট নাতনি বেড়াতে আসল I উনি জানতে পারলেন যে সেদিন ছিল মেয়েটির জন্ম দিন I তখনই তিনি গান লিখে ও সুর দিয়ে গাইলেন: “শিরিন বুবুর জন্ম দিনে …”
মাতৃভাষা আন্দোলনে এবং মুক্তি যুদ্ধে আব্দুল লতিফ সাহেবের অবদান অনেক I উনি ওনার বিখ্যাত “ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়” গানটি গাইতেন ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় বিদ্রোহী মিছিলের সামনে চলতে চলতে I পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অনেক চেষ্টা করেছিল ওনাকে মেরে ফেলতে I ২৬শে মার্চ হানাদার বাহিনী ওনার সেকেন্ড ক্যাপিটালের বাড়িতে হানা দেয় I সৌভাগ্যবশত উনি এবং ওনার পরিবারের সবাই তার আগের রাতে বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন I তার পর উনি ৯ মাসের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন মাঠে এবং জঙ্গলে I বিভিন্ন গ্রামের কৃষক শ্রমিক পরিবারের মা বোনেরা ওনাকে খাইয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সেই লম্বা ৯ মাস I পাকিস্তানিরা ওনার ঘরে যা কিছু ছিল তা সবই ধ্বংশ করে ফেলেছিল I ওনার লেখা ৩৫০০ খানা গানও তারা ধ্বংশ করেছিল I স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সূত্র থেকে ওনার লিখা ২৫০০ খানা গান আবার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে I
আব্দুল লতিফ সাহেব অনেক রকম গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন ও গেয়েছেন: পল্লী গীতি, দেশাত্মবোধক গান, জারি, পুথি , আরো কতকি I ওনার লেখা আধ্যাত্মিক গানগুলো অত্যন্ত উচ্চ মানের I আসলে উনি ছিলেন একজন সত্যিকারের সুফি I ওনার লেখা ও জীবন ধারায় তা প্রমানিত হয় I
আব্দুল লতিফ সাহেবের বাড়িতে হত বিখ্যাত শিল্পীদের আড্ডা I কয়েকজন বিখ্যাত শিল্পী ওনার হাতে তৈরী I তাদের ভেতর আব্দুল আলিম ও ফেরদৌসী রহমান অন্যতম I আব্দুল আলিম সাহেব ঘন ঘন আব্দুল লতিফ সাহেবের বাড়িতে আসতেন এবং বলতেন, “লতিফ ভাই , আমার জন্য আর একটা গান লিখে দেন ,” “লতিফ ভাই , আমাকে আর একটা গান শিখিয়ে দেন I” মৃত্যুর আগে আলিম সাহেব তার পরিবারকে তার শ্রদ্ধেয় লতিফ ভাইর কাছে সপে দিয়ে বলেছিলেন, “আমি আমার পরিবারের দেখাশুনার সমস্ত দায়িত্ব আপনাকে দিয়ে গেলাম I” আব্দুল লতিফ সাহেব এবং তার স্ত্রী সেই দায়িত্ব পালন করেছেন I
আব্দুল লতিফ সাহেবের সাথে ফেরদৌসী রহমানের সম্বন্ধ ছিল অত্যন্ত সুমধুর I ফেরদৌসী রহমান আব্দুল লতিফ সাহেবকে ডাকতেন ‘লচা’ বলে – লতিফের ল এবং চাচার চা I লচা ফেরদৌসীকে ডাকতেন “গা গা মা“ I ফেরদৌসী রহমান তার লচাকে কখনো ভুলেননি I
আব্দুল লতিফ সহেবের কথা বলতে গেলে আব্দুল গফফার চৌধুরীর বিখ্যাত একুশের গান “ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” সম্বন্ধে একটা কথা বলা দরকার I ১৯৫২ সালে আব্দুল গফফার চৌধুরী সাহেব ছিলেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী I ২১শে ফেব্রুয়ারী তিনি শহীদ রফিকের মরাদেহ দেখেছিলেন I তিনি বলেছেন,”আমি আরো দু‘জন বন্ধু নিয়ে গিয়েছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের আউটডোর কক্ষে৷ সেখানে বারান্দায় শহীদ রফিকের লাশ ছিল৷ মাথার খুলিটা উড়ে গেছে৷ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তখন ছাত্র৷ তিনি তাঁর ক্যামেরায় রফিকের ছবি তোলেন৷“সেই বছরেই আব্দুল গফফার চৌধুরী সাহেব একখানা কবিতা আকারে লিখলেন ” আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” I কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকার একটা খবরের কাগজে I সেই কাগজটি কবিতার লেখকের নাম প্রকাশ করেনি I পরে ১৯৫৪ সালে হাসান হাফিজুর রহমান একখানা একুশের সংকলন প্রকাশ করেন I আব্দুল গফফার চৌধুরীর গানটিও সেই সংকলনে স্থান পায় I তখনকার পাকিস্তানি সরকার সেই সংকলনটি বাজেয়াপ্ত করে।
আব্দুল লতিফ সহেব ছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম সাহেবের ঘনিষ্ট বন্ধু I ডক্টর রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই আতিকুল ইসলাম একদিন “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” কবিতাটি আব্দুল লতিফ সহেবের কাছে নিয়ে আসল I সেই দিনই আব্দুল লতিফ সহেব এই কবিতায় সুর দিলেন I কয়েকদিন পরে ঢাকা কলেজের কিছু ছাত্র কলেজ প্রাঙ্গনে শহীদ মিনার স্থাপনের চেষ্টা করার সময় আব্দুল লতিফ সাহেব সেই গানটি গেয়েছিলেন । এর ফলে কলেজ কয়েকজন ছাত্রদেরকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করে দেয়, এবং পাকিস্তানি সরকার আব্দুল লতিফ সাহেবকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় I ওনার পরিচিত বাঙালি অফিসাররা ওনাকে সেই বিপদ থেকে বাচান I
পরবর্তিতে আব্দুল লতিফ সাহেবের বাড়ির কাছে মুলাদির শহীদ আলতাফ মাহমুদ সাহেব ” আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানটিতে দ্বিতীয়বার সুরারোপ করেন I আলতাফ মাহমুদ সাহেবের সুরে গানটি শুনে আব্দুল লতিফ সাহেবে সাহেব বললেন, “এখন থেকে আলতাফ মাহমুদের দেওয়া সুরেই এই গান খানা গাওয়া হবে I ” আব্দুল লতিফ সাহেবের এই সিদ্ধান্ত তার হৃদয়ের উদারতারই পরিচয় দেয় I এ ব্যাপারে আব্দুল গাফফার চৌধুরী সাহেব লিখেছেন, “…লতিফ ভাই আরেকটি কাজ করেছিলেন। সে কাজটি হল, আমার লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ শীর্ষক কবিতাটিতে সুরারোপ করে তাকে গানে পরিণত করা। লতিফ ভাইয়ের সুরেই গানটি প্রথম গীত হয়। তারপর আরেক সুরশিল্পী আলতাফ মাহমুদ গানটিতে দ্বিতীয়বার সুরারোপ করেন। লতিফ ভাইয়ের সুরটি কেবল জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল। কিন্তু আলতাফ মাহমুদ দ্বিতীয়বার গানটিতে সুরারোপ করার পর লতিফ ভাই সবার আগে তাকে অভিনন্দন জানান এবং বলেন, ‘আলতাফ তোমার সুরেই গানটি গাওয়া হোক I’ ”
আব্দুল লতিফ সাহেব মানুষকে অত্যন্ত ভালো বাসতেন I উনি ঈদের সময় কাপড় চোপড় কিনতেন ওনার নাপিত, বাজারের মাছ ব্যবসাই ও অন্যান্য গরিব লোকের ছেলেমেয়েদের জন্য I মানুষও ওনাকে খুব ভালবাসত I উনি যখন কাচা বাজারে যেতেন অথবা রাস্তা দিয়ে হাটতেন তখন চার দিক থেকে লোকজন উচু গলায় বলত: “লতিফ ভাই, আসসালামু আলায়কুম“, “লতিফ ভাই কেমন আছেন ?”
আর্থিক দিক থেকে আব্দুল লতিফ সাহেবের অবস্থা ছিল অস্বচ্ছল I একখানা সাইকেলে চড়ে উনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধনী লোকের মেয়েদেরকে গান শিখাতেন I মাঝে মাঝে রেডিওতেও গান গাইতেন এবং গান শিখাতেন I এই দুই সূত্র থেকে যা আয় হত তাদিয়ে উনি কোনো রকম সংসার চালাতেন I ওনার স্ত্রী এবং দুটো ছেলে মেয়েকে নিয়ে উনি থাকতেন হাসিনা মঞ্জিলের পিছে চাঁদ খান পুল লেনের একটা এক-রুম বাসায় I ওনার স্ত্রী রান্না করতেন তাদের খোলা বারান্দায় একখানা পোরটেবল মাটির চুলায় I খাওয়া দাওয়া হত শোয়ার ঘরে সিমেন্টের ফ্লোরের উপর I ওনার আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন আসল দেশের স্বাধীনতার পর I বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পরেই একদিন এক ভদ্রলোক লতিফ সাহেবের কাছে এসে বললেন, ”বঙ্গবন্ধু আপনাকে তার সাথে দেখা করতে বলেছেন I” আব্দুল লতিফ সাহেব ভয় পেয়ে গেলেন I উনি ভাবলেন: “আমি কি কোনো অন্যায় করেছি যার জন্য বঙ্গবন্ধু আমার সাথে রাগ করবেন ?” বঙ্গবন্ধুর আদেশ অমান্য করা সম্ভব নয় I তাই আব্দুল লতিফ সাহেব ভয়ে ভয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলেন I বঙ্গবন্ধু আব্দুল লতিফ সাহেবকে বললেন, “লতিফ, তুই কাল থেকে Information and Broadcasting বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি হিসাবে কাজ করবি I” আব্দুল লতিফ সাহেব বললেন, “বঙ্গবন্ধু, আমিতো লেখাপড়া জানিনা I আমি কেমন করে ডেপুটি সেক্রেটারির কাজ করব ?” আব্দুল লতিফ সাহেব বরিশাল শহরের একটা হাই স্কুলে মাত্র ক্লাস সিক্স পর্যন্ত লেখা পরা করেছিলেন I বঙ্গবন্ধু বললেন, “আমি জানি তুই এই কাজ করতে পারবি I”
এখন আমি একটা গল্প বলব I এই গল্পটা হলো আব্দুল লতিফ সাহেবের ছোট বয়সে প্রথমবার গান গাওয়া নিয়ে I উনি তখন প্রাইমারি স্কুলে দিতীয় শ্রেনীর ছাত্র I ওনার স্কুলটা ছিল বরিশালের রায়পাশা গ্রামে বোশ বাড়ি I একদিন সেই স্কুলে একটা গানের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল I সেই অনুষ্ঠানে আব্দুল লতিফ সহেবের গান গাওয়ার কথা ছিল I ওনার গান গাওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বক্ষণে উনি গান গাওয়ার ভয়ে স্কুল ঘর থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলেন I আব্দুল লতিফ সাহেব নিজে বলেছেন, ‘স্ক্রীন ওঠামাত্র আমার দু‘হাঁটু কাঁপছে তো কাঁপছে, টিকতে না পেরে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেও পারিনি। হেড মাস্টার জোর করে ধরে আনলেন স্টেজে। কী আর করি। এক রকম বলির পাঁঠার মতো গানটা গাই আরকি। তারপর থেকেই সাহস বাড়ল, হারমোনিয়ামের সুর উঠিয়ে গান ধরলাম প্রাণ ভরে।‘ সেদিন ওনার ‘হে দয়াময় রহমান রহিম‘ গানটি শুনে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল I পরবর্তিতে বোশ বাড়ির লোকেরাই আব্দুল লতিফ সাহেবকে কোলকাতা নিয়ে যায়, এবং তাদের বাড়ি রেখে এক হিন্দু ওস্তাদকে দিয়ে ওনাকে গান শিখান I তখনকার দিনে ছিল অস্পৃশ্যতার যুগ I সেই যুগে একটা হিন্দু পরিবার একটা মুসলমান ছেলেকে তাদের বাড়িতে রেখে গান শিখিয়েছে–এটা একটা অসাধারণ ব্যাপার ছিল I
আব্দুল লতিফ সাহেব ২০০৫ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন । মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র, দুই কন্যা এবং ৭ জন নাতি নাতনি রেখে যান